তোরাহ কি সত্যিই বিকৃত হয়েছে?
- সত্য অন্বেষী

- Dec 20, 2025
- 3 min read
মুসলিম–খ্রিস্টান আলোচনায় একটি প্রশ্ন খুবই সাধারণভাবে শোনা যায়:
তোরাহ কি বিকৃত হয়ে গেছে?
এই দাবি ইসলামী বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ যদি বলা যায় যে আগের ধর্মগ্রন্থগুলো আর নির্ভরযোগ্য নেই, তাহলে কুরআনকেই একমাত্র সংরক্ষিত ও নির্ভুল ঐশী গ্রন্থ হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। আমরা যদি কুরআন নিজেই কী বলে তা মনোযোগ দিয়ে পড়ি এবং তার সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রমাণ মিলিয়ে দেখি, তাহলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে।
তোরাহ বিকৃত হয়েছে এই ধারণা কি সত্যিই কুরআনের শিক্ষার সঙ্গে মেলে?
এই লেখায় আমরা বিষয়টি দুটি দিক থেকে সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করব।
১) মুহাম্মদের সময়ে তোরাহ সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্য
২) তার বহু আগের সময়ের তোরাহ সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রমাণ
১. মুহাম্মদের সময়ে তোরাহ সম্পর্কে কুরআন কী বলে
অনেক মুসলমান ছোটবেলা থেকেই শোনেন যে তোরাহ বিকৃত হয়েছে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নগুলো তোলা হয়: কখন বিকৃত হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, আর কারা করেছে?
এই অস্পষ্টতাকে পরিষ্কার করতে একটি খুব সাধারণ প্রশ্নই যথেষ্ট।
তোরাহ কি মুহাম্মদের আগে বিকৃত হয়েছিল, না মুহাম্মদের পরে?
কারণ কুরআন নিজেই বারবার তোরাহকে এমন একটি জীবিত ও কার্যকর ধর্মগ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করে, যা সপ্তম শতাব্দীতেও মানুষের হাতে ছিল এবং পড়া হতো।
কুরআন তোরাহকে কীভাবে উল্লেখ করে
কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আমরা দেখি, তোরাহ সম্পর্কে খুব স্পষ্ট কথা বলা হয়েছে।
কুরআন বলে, ইহুদিরা তাদের তোরাহতেই মুহাম্মদের বর্ণনা খুঁজে পেত।
কুরআন বলে, ইহুদিদের কাছে এমন একটি তোরাহ ছিল যেখানে আল্লাহর বিধান সংরক্ষিত ছিল, এমনকি ব্যভিচারের মতো আইনের শাস্তিও সঠিকভাবে উল্লেখ ছিল।
কুরআন মূসা, নূহ, ইউসুফসহ বহু নবীর কাহিনি আগের শাস্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করে।
এখন একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে।
যদি তোরাহ সত্যিই বিকৃত হতো, তাহলে কুরআন কেন বারবার তাকে সত্যের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করবে?
একটি বিকৃত গ্রন্থ কখনোই সত্যকে নিশ্চিত করার ভিত্তি হতে পারে না।
২. পাঠ্য বিকৃতি আর অবাধ্যতা এক বিষয় নয়
অনেক সময় বলা হয়, বিকৃতি মানে আসলে লেখা বদলানো নয়, বরং ভুলভাবে মানা বা অমান্য করা। এই কথাটি আসলে কুরআনের সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কুরআন যখন বনী ইসরাইলকে তিরস্কার করে বলে, তোমরা ন্যায়ের কথা বলো কিন্তু নিজেরা তা মানো না, তখন সেটি আচরণের সমালোচনা। সেখানে কোথাও বলা হয়নি যে তারা শাস্ত্রের লেখা বদলে ফেলেছে।
আমরা সবাই জানি, কেউ যদি আইন ভাঙে, তাতে আইন বদলে যায় না।
দশ আজ্ঞা অমান্য করলেও দশ আজ্ঞার বাক্য পাল্টে যায় না।
কুরআনের সমালোচনার লক্ষ্য মানুষ, পাণ্ডুলিপি নয়।
৩. তোরাহর ধারাবাহিক সংরক্ষণ
কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি তোরাহকে একটি ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষিত গ্রন্থ হিসেবে তুলে ধরে।
তোরাহ মূসার কাছে অবতীর্ণ হয়।
পরবর্তী নবীরা সেই তোরাহ অনুযায়ী বিচার করেন।
রাব্বি ও আলেমরা এর রক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
ইয়াহইয়া বা যোহন বাপ্তিস্মদাতাকে বলা হয় শাস্ত্র দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে।
মরিয়ম আল্লাহর বাণী ও শাস্ত্রের সাক্ষ্য দেন।
ঈসা তাঁর আগে অবতীর্ণ তোরাহকে নিশ্চিত করেন।
মূসা থেকে ঈসা পর্যন্ত কুরআনের বর্ণনায় কোথাও এমন ইঙ্গিত নেই যে এই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে।
আর ইসলামের দৃষ্টিতে নবীরা পাপ থেকে রক্ষিত। সুতরাং প্রশ্ন আসে, কোন নবী তোরাহ বিকৃত করলেন?
কেন কুরআন তাদের অভিযুক্ত করে না?
আর ঈসা কেন একটি বিকৃত গ্রন্থকে নিশ্চিত করবেন?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর কুরআনে নেই, কারণ কুরআন এমন বিকৃতির কথাই বলে না।
৪. কুরআন সংশোধন নয়, নিশ্চিত করে
আরেকটি কথা প্রায়ই বলা হয়, কুরআন আগের শাস্ত্রগুলোর উপর কর্তৃত্ব রাখে, তাই সেগুলো ঠিক করে দেয়। কিন্তু কুরআনের ভাষা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে বারবার “নিশ্চিত করা” কথাটাই ব্যবহৃত হয়েছে।
মুসলমানরাও তো কোনো নবীর দাবি যাচাই করেন এভাবেই।
আগের ওহির সঙ্গে মিললে গ্রহণ করেন।
বিরোধিতা করলে প্রত্যাখ্যান করেন।
এই একই যুক্তিতে কুরআন তোরাহকে ব্যর্থ গ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং একটি বৈধ মানদণ্ড হিসেবে ধরে।
৫. যারা আগে কিতাব পড়ে, তাদের জিজ্ঞেস করো
কুরআনে একটি আয়াত আছে যেখানে বলা হয়, যদি কোনো বিষয়ে সন্দেহ হয়, তাহলে যারা আগে কিতাব পড়ে তাদের জিজ্ঞেস করতে।
এখানে খুব স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন আসে।
যদি আগের কিতাবগুলো বিকৃত হতো, তাহলে তাদের কাছে জিজ্ঞেস করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে?
এই আয়াত ধরে নিচ্ছে যে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছে এমন শাস্ত্র আছে, যা বিশ্বাসযোগ্য।
৬. ইতিহাস কী বলে
এবার আসি ইতিহাসে।
ডেড সি স্ক্রলস নামে পরিচিত পাণ্ডুলিপিগুলো খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতাব্দী আগের। এই স্ক্রলসের তোরাহ অংশগুলো আজকের হিব্রু তোরাহর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, পাঠ্য প্রায় একই।
পার্থক্য আছে, কিন্তু সেগুলো বানান বা শব্দের সামান্য পরিবর্তন। বিশ্বাস, আইন বা কাহিনিতে কোনো বড় পার্থক্য নেই।
এর মানে হলো, মুহাম্মদের বহু শতাব্দী আগেও তোরাহ যেমন ছিল, মূল কাঠামো আজও তেমনই আছে।
তোরাহ বিকৃত হয়েছে দাবি করতে হলে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন তোরাহর অস্তিত্ব দেখাতে হবে, যা ঐ সময়ের মধ্যে কোথাও ছিল। এমন কোনো প্রমাণ ইতিহাসে নেই।
উপসংহার
তাহলে আবার প্রশ্নটি করি।
তোরাহ কি বিকৃত হয়েছে?
কুরআনের ভাষায় না।
ইসলামের নবী-তত্ত্ব অনুযায়ী না।
ইতিহাস ও পাণ্ডুলিপির আলোকে না।
কুরআনের সমালোচনা মানুষের অবাধ্যতার প্রতি, শাস্ত্রের পাঠ্যের প্রতি নয়। তোরাহকে বারবার সংরক্ষিত, কর্তৃত্বপূর্ণ এবং নিশ্চিতকৃত গ্রন্থ হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।
তোরাহ বিকৃত হয়েছে এই ধারণাটি জনপ্রিয় হলেও, গভীরভাবে দেখলে এটি কুরআন, ইতিহাস এবং সাধারণ যুক্তির সামনে টিকে থাকে না।
আর তাই এই প্রশ্নটি শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি সত্যিই আমাদের ভাবতে বাধ্য করে।








Comments